হিজামা : তিব্বে নববীর সার্জিক্যাল থেরাপি

 হাকীম এফ শাহজাহান :: হিজামা কমপক্ষে ৫ হাজার বছরের প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি। বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সা:) বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে এই চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে মুসলিম উম্মাহকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন। সেজন্য এটিকে সুন্নতি চিকিৎসা পদ্ধতিও বলা হয় ।
পৃথিবীতে প্রচলিত সব ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতেই হিজামা স্বীকৃত হয়ে আসছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতেও এটি স্বীকৃত। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে হিজামাকে কাপিং থেরাপি বলা হয়। এখন অনেক আধুনিক চিকিৎসকও হিজামার চর্চা করছেন।
হিজামার গ্রহণযোগ্যতা
complementary and alternative medicine[CAP] হিসেবে হিজামা চিকিৎসা সারাবিশ্বেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশ্ববিখ্যাত অনেক তারকা খেলোয়াড় হিজামা চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন এবং তা থেকে রোগ নিরাময়ের ফলে এই চিকিৎসার বেশ প্রশংসা করে প্রচারণা চালিয়েছেন । ফলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সারা বিশ্বে একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে ।
বিশেষ করে অলিম্পিক খেলায় অনেক তারকা খেলোয়াড়কে হিজামা থেরাপি নিতে দেখা গেছে । তারা বিশ্ব মিডিয়ায় তারা সেটার প্রচারও করেছেন। তারা ঘাড় ও পিঠের পেছনের ব্যাথার ক্ষেত্রে হিজামা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ।
হিজামার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ধারণা করা হয়, এখন থেকে প্রায় ৩০০০ বছর পূর্বে এটি চালু হয়৷ বর্তমানে আরব, আফ্রিকা, চীন ও কোরিয়ার কিছু অঞ্চলে হিজামা বেশ জনপ্রিয়৷
কোন কোন রোগে হিজামা করাবেন ?
বাত ব্যথা, পা ফুলা, পিঠ ও কাঁধের ব্যথা, অর্ধ ও পূর্ণাঙ্গ শরীর অবশ, প্রসব পরবর্তী ব্যথা, মাইগ্রেন, পেটব্যথা, যৌন দুর্বলতা, কাশি, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, পাকস্থলি, কিডনি ও লিভারের বিভিন্ন সমস্যা, চর্মরোগ, নাক ও কানের প্রদাহ ও ছানিসহ চোখের বিভিন্ন সমস্যা য় হিজামা গ্রহণ করা হয়।
হিজামা নিয়ে বিতর্ক
হিজামা নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কও আছে। এটি কি আসলে উপকারী কোন চিকিৎসা কিনা এই নিয়ে কেউ কেউ সন্দেহ পোশন করেন । এতে কি মানুষের ক্ষতি হতে পারে কিনা এসব প্রশ্নও আছে ।
যথেষ্ট তত্ত্ব ও উপাত্ত্ব এবং স্টাডি রিপোর্ট বলছে দক্ষ হিজামা থেরাপিস্ট সহকারে কারো হিজামা করা হলে তার কোন ক্ষতি হবার আশংকা নেই,বরং দেহের অনেক জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধি হিজামার মাধ্যমে নিরাময় করা সম্ভব।
হিজামা নিয়ে বর্তমানে কিছু বিতর্ক থাকলেও এ নিয়ে আধুনিক চিকিৎবিজ্ঞানেও স্টাডি ও গবেষণা হচ্ছে। মুসলিম উম্মাহ এই চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কখনোই কোন সন্দেহ সংশয় পোষন করেন না। সেটা করার সুযোগও নেই। তবে ইসলাম বিরোধীরা অন্যান্য বিষয়ে এই হিজামা চিকিৎসা পদ্ধতির বিরুদ্ধেও নানা কায়দায় অপপ্রচার চালান। সেটা বিশ্বাস করা না করা আপনাদের বিষয়।
হিজামার প্রকারভেদ
হিজামা বা কাপিং থেরাপি মূলত দুই ধরনের । ড্রাই এবং ওয়েট কাপিং। ওয়েট কাপিংকেই মূলত হিজামা বলা হয়। উপকারিতার দিক থেকে হিজামা সর্বোত্তম। এটি শুধু ইসলামিক চিকিৎসা বলেই উত্তম, তা নয়। গবেষণা দ্বারা এটাই প্রমাণিত। এছাড়াও ফ্লাশ কাপিং,নিডল কাপিং,ফায়ার কাপিং,মেডিসিনাল কাপিং,মুভিং কাপিং নামের হিজামার বেশ কিছু প্রকার আছে।
হিজামার ধর্মীয় গুরুত্ব
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) হিজামাকে উদ্ধুদ্ধ করেছেন, যা বুখারি শরিফের ৫২৬৩ এবং মুসলিম শরিফের ২৯৫২ নং হাদীেসে বর্নিত হয়েছে।
এছাড়াও আরেকটি সহীহ হাদীসে রয়েছে,হযরত আবু হুরাইরা রদিয়াল্লহু আনহু থেকে বর্ণিত : রসূলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জিবরীল আমাকে জানিয়েছেন যে, মানুষ চিকিৎসার জন্য যতসব উপায় অবলম্বন করে, তম্মধ্যে হিজামাই হল সর্বোত্তম।” আল-হাকিম, হাদীছ নম্বর : ৭৪৭০।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্নিত,নবী করিম (সা.) বলেন,‘রোগমুক্তি তিনটি জিনিসের মধ্যে নিহিত। এগুলো হলো, শিঙা লাগানো, মধু পান করা এবং আগুন দিয়ে গরম দাগ দেওয়া। তবে আমি আমার উম্মতকে আগুন দিয়ে গরম দাগ দিতে নিষেধ করি।’ সহিহ বোখারি: ৫৬৮১।
হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কেউ হিজামা করতে চাইলে সে যেন আরবী মাসের ১৭, ১৯ কিংবা ২১ তম দিনকে নির্বাচিত করে। রক্তচাপের কারণে যেন তোমাদের কারো মৃত্যু না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখবে।” সুনানে ইবনে মাজা, হাদীছ নম্বর: ৩৪৮৬।
হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আমি মেরাজের রাতে যাদের মাঝখান দিয়ে গিয়েছি, তাদের সবাই আমাকে বলেছে, হে মুহাম্মদ, আপনি আপনার উম্মতকে হিজামার আদেশ করবেন।” সুনানে তিরমিযী হাদীছ নম্বর: ২০৫৩।
হযরত জাবির রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় হিজামায় শেফা রয়েছে।” সহীহ মুসলিম, হাদীছ নম্বর: ২২০৫।
হযরত আবদুল্লাহ বিন উমর রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “খালি পেটে হিজামাই সর্বোত্তম।এতে শেফা ও বরকত রয়েছে এবং এর মাধ্যমে বোধ ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়। ( সুনানে ইবনে মাজা, হাদীছ নম্বর: ৩৪৮৭)
হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “হিজামাকারী কতইনা উত্তম লোক। সে দূষিত রক্ত বের করে মেরুদন্ড শক্ত করে ও দৃষ্টিশক্তি প্রখর করে।” সুনানে তিরমিযী, হাদীছ নম্বর: ২০৫৩।
ইবনু উমার বলেন,আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি: বাসি মুখে রক্তমোক্ষণ করানো উত্তম, তা জ্ঞান বৃদ্ধি করে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে এবং হাফেজের মুখস্থ শক্তি বৃদ্ধি করে। কেউ রক্তমোক্ষণ করাতে চাইলে যেন আল্লাহর নামে বৃহস্পতিবারে তা করায়। তোমরা শুক্র, শনি ও রবিবার রক্তমোক্ষণ করানো পরিহার করো এবং সোমবার ও মঙ্গলবার রক্তমোক্ষণ করাও, কিন্তু বুধবার তা করাবে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিজামা
ইন্টারন্যাশনাল কাপিং থেরাপি এসোসিয়েশন ICTA বলেছে হিজামা বা কাপিং থেরাপি একই সাথে একজন মানুষের একাধিক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার উপশম করতে পারে।
হিজামার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
হিজামাতে যে দূষিত প্লাজমা বেরিয়ে আসে তাতে থাকে একাধিক রোগের জীবাণু যেমন ঠাণ্ডা, কাশি, বিষন্নতা, আরথ্রাইটিস, কোমরের সায়াটিকার ব্যথা,চিন্তা, ঘুমের সমস্যা, মাংসপেশির ব্যথা এবং অন্যান্য সকল রোগের তীব্রতাও কমে আসে।
হিজামা স্নায়ুতন্ত্রের সিস্টেমে সেরোটোনিন, ডোপামাইন, এন্ডোরিফিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার এর মাধ্যমে একযোগে একাধিক শারীরিক উপশমে ভূমিকা রাখে
হিজামা সংক্রান্ত স্টাডি রিপোর্ট অনুযায়ী উচ্চরক্তচাপ, হার্ট এটাক, হাত-পায়ের খিচুনী, DVT (Deep vein Thrombosis for blood clot in deep vein), মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন যার কারণে ঘাড় ও গলায়, কাঁধে, বাহুতে, পিঠে অথবা চোয়ালে ব্যথা হয় নিয়মিত হিজামা থেরাপিতে কমে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা গেঁটে ব্যথা, বাতের ব্যথা,পিঠের ব্যথা ও মেরুদন্ডের ব্যথা, ফিব্রোমায়ালজিয়া, হাটুর অস্ট্রিওআর্থারাইটিস অর্থাৎ হাটু ক্ষয়, হার্ণিয়ার সমস্যা, ঘাড় ও কাঁধের ব্যথা, দীর্ঘকালীন পিঠের ব্যথা, মাংশপেশীর ব্যথা, মচকে যাওয়া , পায়ে পানি আসা, ফুলে যাওয়া কিংবা আঘাতের কারণে ফেটে যাওয়ার ব্যথায় হিজামা খুব ভালো কাজ করে।
হিজামা নিয়ে গবেষণার ফলাফল
হিজামার কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা তথ্য বলছে এক মাস পর ৩৪%, দুই মাস পর ৪০% এবং তিন মাস পর প্রায় ৬০% শতাংশ ব্যথা কমেছে। ভাইরাল এবং ইনফেকশাস রোগ কমায় ও প্রতিরোধ বাড়ায়। হিজামা হারপিস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ভাইরাল হেপাটাইটিস, ব্রণ, ডার্মাটাইটিস, এবং সেলুলাইটিস এসব স্বাস্থ্য সমস্যা যা হিজামা কাপিং থেরাপি দ্বারা চিকিৎসা করা যায়।
হিজামা মাথা ব্যথার জন্য খুব ভালো ওষুধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যে রোগীরা ২৮ দিনের ভেতর ৩ বার হিজামা করিয়েছে তাদের ব্যথার তীব্রতায় ৬৬% সুস্থতা এসেছে বলে অন্য আরেকটি স্টাডি রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে।
শেষ কথা হচ্ছে, দক্ষ এবং যোগ্য চিকিৎসকের মাধ্যমে সঠিক পদ্ধতিতে হিজামা করানো না হলে অবশ্যই রোগ নিরাময় । তা না হলে হিজামার কোন সুফল পাওয়া যাবে না।
হিজামার কোন সাইডইফেক্ট নেই, এটাও বুঝতে হবে।
হাকীম এফ শাহজাহান
ডিইউএমএস
হামদর্দ ইউনানী মোডকেল কলেজ ও হাসপাতাল,বগুড়া।
চেম্বার: শেফা স্মার্ট হাসপাতাল,খান্দার তিনমাথা মোড়,বগুড়া।
০১৭৩৫ ৭০২৭৫২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *