সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া : নিরবে নি:শব্দে যেভাবে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়

হাকীম এফ শাহজাহান :: নিরব ঘাতক। নি:শব্দ বিপদ। নিরবে নি:শব্দে এই বিপদ মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। মেডিকেল সায়েন্সের ভাষায় একে বলে ‘সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া’। এই ‘সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া’ কার শরীরে কখন বাসা বাঁধে তা বুঝতে দেয়না। শরীরে ঢুকেই ঘাপটি মেরে থাকে। ঠিক ওৎপেতে থাকা কালসাপের মত। সুযোগ পেলেই ছোঁবল মারে।
আপনি করোনা আক্রান্ত হয়ে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। হাঁচি,কাশি সর্দিজ্বর কোন উপসর্গই নেই। এরপর হঠাৎ করে আপনি মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছেন। তার অর্থ হচ্ছে ‘সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া’আক্রান্ত কেউ করোনা আক্রান্ত হলেই এই কালসাপ তাকে ছোঁবল মারে।
সেজন্য করোনা মহামারি দু:সময়ে সুস্থ থাকতে সচেতনতাই সবচেয়ে বেশি জরুরী। আমাদের শরীরে অজান্তে এমন কিছু নিরব ঘাতক বাসা বাঁধে যা করোনাভাইরাসের সংক্রমনকে তীব্র করে দিতে পারে এবং শরীরে ঘাপটি মেরে থাকা নিরব ঘাতকের কারনে মানুষের মৃ্ত্যু ঘটিয়ে ছাড়ে। তাই মহামারি চলাকালে সতর্ক থাকা উচিত যে আপনার শরীরে নিরবে নি:শব্দে সেই গুপ্ত ঘাতক বাসা বেঁধেছে কিনা।
কীভাবে বুঝবেন সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া ?
এই ভয়ংকর নিরব ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিশেষ একটি সহজ পরীক্ষার কথা বলছেন। আপনি নিজেই একটা পালস অক্সিমিটারে দিয়ে বুঝতে পারবেন আপনি সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়ায় আক্রান্ত কিনা। এজন্য স্বাভাবিক অবস্থায় পালস অক্সিমিটারে জেনে নিন আপনার অক্সিজেনের মাত্রা। ৬ মিনিট হাঁটার পর আবার মাপুন অক্সিজেন। এবার যদি আগের চেয়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়,তাহলে বুঝবেন আপনার শরীরে সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া বাসা বেঁধেছে।
করোনা রোগীর ক্ষেত্রে সেই ‘নি:শব্দ বিপদ’ চিহ্নিত করতে রোগীকে ছয় মিনিট হাঁটিয়ে তারপর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা নির্নয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পালস অক্সিমিটারে ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশ অক্সিজেন মাত্রাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। ৯৫ শতাংশের কম হলে চিকিৎসার ভাষায় হাইপোক্সিয়া বলা হয়। শরীরে তখন অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। তখন শ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। সঙ্গে মাথাব্যথা, বুকব্যথা, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে।
ভারতের কোভিড কেস ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশিকায় ছয় মিনিট হাঁটার পরীক্ষা চিকিৎসা পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়ার আভাস পেতে ইতিমধ্যে হাঁটার পরীক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্য দফতর। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দফতরও এই পদ্ধতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন,করোনায় যে-ধরনের শারীরিক পরিস্থিতি রোগীকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে,‘সাইলেন্ট হাইপোক্সিয়া’ তার অন্যতম। দেখা যাচ্ছে, রোগীর শ্বাসকষ্টের কোনও উপসর্গ নেই। অথচ চুপিসারে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমে সুস্থ রোগীকে হঠাৎ হঠাৎ আশঙ্কাজনক করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অভিমত
ছয় মিনিটের হাঁটার এই পরীক্ষা সম্পর্কে মেডিসিনের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় পাল জানান, হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীদের অসুস্থতা বাড়ছে কি না,তা দ্রুত চিহ্নিত করা জরুরি। সেই জন্য পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা মেপে রোগীকে ছয় মিনিট হাঁটতে বলা হয়। ৩৬০ সেকেন্ড হাঁটার পরে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে বুঝতে হবে, রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করানো দরকার।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন,‘‘কো-মর্বিডিটি রয়েছে,এমন রোগীদের ক্ষেত্রে তিন মিনিট, নইলে ছয় মিনিট হাঁটিয়ে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক কতটা,তা বোঝা সম্ভব।’’
অ্যাপোলো গ্লেনেগলসের পালমোনোলজিস্ট সুস্মিতা রায়চৌধুরী জানান,অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, রোগী বিশ্রামে থাকাকালীন তাঁর দেহে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু হাঁটার পরে অক্সিজেনের মাত্রা যাচ্ছে কমে।
অসুখ যে বাড়ছে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি উপকারী।করোনা বিশেষজ্ঞ প্রায় সব চিকিৎসক মনে করছেন,ছ’মিনিট হাঁটানোর পর পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেন পরীক্ষা পদ্ধতির বাস্তবসম্মত প্রয়োগ জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *