মায়ের শালদুধ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভ্যাকসিন : বাঁচাবে করোনা মহামারি থেকেও

 হাকীম এফ শাহজাহান :: মায়ের বুকের শালদুধ পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভ্যাকসিন। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোন ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি,যা মায়ের বুকের শালদুধের সমতুল্য হতে পারে। এটা হওয়া সম্ভবও নয়,কারণ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহই এই ভ্যাকসিন সৃষ্টি করে মায়ের বুকের দুধে রেখেছেন।
একজন গর্ভবতী মা সন্তান জন্মদানের পরপরই তার বুকে যে দুধ আসে  সেটাকেই শালদুধ বলে। গাঢ় ঘন আঠালো এবং বাদামী রংয়ের এই শালদুধ  মায়ের বুকের সাধারন দুধ থেকে আলাদা বৈশিষ্ঠ্য ও গুনের হয়ে থাকে। অনেকে না জানার কারনে মায়ের বুকে থাকা শিশুর জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভ্যাকিসিন এই মহামূল্যবান শালদুধ ফেলে দিয়ে তারপর সাধারন দুধ খাওয়ান। সর্বনাশটা এখোনেই শুরু হয়। শালদুধ শুধু সর্বশ্রেষ্ঠ ভ্যাকসিনই নয়, শিশুর মেধা, প্রজ্ঞার ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা  বৃদ্ধির সর্বপ্রথম মেডিসিন।
মায়ের সেই শালদুধ খেয়ে সদ্য জন্মানো একটি মানব শিশু যেনো আজীবন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পায় সেই ব্যবস্থাও করেরেখেছেন আল্লাহ। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য এখনো অনেক মা তার নবজাতক শিশুকে জন্মের পরপরই শালদুধ খাওয়ান না। শালদুধ খাওয়া একটা শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আর না খাওয়া শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষতায় আকাশ পাতাল পার্থক্য । যার ফলে আমাদের অনৈকের শীররের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি আবার অনেকের খুব কম।
পৃথিবীতে জন্মের পরপরই মানব শিশুকে আল্লাহ সেই শক্তিশালী ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছেন মায়ের বুকে। মায়ের বুকের শালদুধ যে সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন সেটা কোন আবেগ তাড়িত কথা নয়। রীতিমত আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার ফলাফল।
আমি নিজেও দীর্ঘ ৫ বছর বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্টে এবং জাতীয় পুষ্টি প্রকল্পের কাজ করেতে গিয়ে হাতে কলমে ব্রেস্টফিডিং সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেখেছি যে আল্লাহর এক মস্ত বড় নিয়ামত মায়ের বুকের দুধ। একেবারে তৃণমুল পর্যায়ে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে পাড়া মহল্লায় এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে গিয়ে ব্রেস্টফিডিংয়ের বাস্তব উপকারিতা উপলব্ধি করেছি। প্রসুতি মায়েদের নিয়ে ব্রেস্টফিডিংয়ের মোটিভেশনাল গ্রুপ ডিসকাসন সেশন চালিয়ে ব্যাপক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়েরও সুযোগ করে দিয়েছেন আল্লাহ।
জন্মের পরপরই যে শিশুকে মায়ের বুকের শালদুধ খাওয়ানো হয়,সারাজীবন তার শরীরের ভেতর এমন শক্তিশালী এ্যান্টিবডি তৈরি হয় যা তাকে যে কোন বড় ধরনের ব্যাকটেরিয়াল এবং ভাইরাল সংক্রমন থেকে বাঁচিয়ে দেয়। শুধু মায়ের শালদুধই নয়, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সন্তান জন্মের পর দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করলে শিশুর সারাজীবনের জন্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
মায়ের দুধ নিয়ে গবেষণা করে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বলছেন যে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় মায়ের বুকের দুধ এ্যান্ডিবডি হিসেবে কাজ করে।
বিশ্বজুড়ে করোনার দাপট। এই অবস্থায় গোটা পৃথিবী তাকিয়ে রয়েছে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের দিকে। বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে ভ্যাক্সিনের হিউম্যান ট্রায়ালও। এখনও শুধু মারণ ব্যাধির প্রতিষেধক চূড়ান্ত পরীক্ষার পর বাজারে আসার অপেক্ষা।
এরই মাঝে করোনার চিকিৎসায় অ্যান্টিবডি নিয়ে আশার কথা শোনালেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, কোভিড-১৯ সংক্রমিত রোগীদের জন্য সদ্য মা হয়েছেন এমন মহিলাদের বুকের দুধের স্বাদযুক্ত বরফের কিউব এই জীবনঘাতী সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়ক হতে পারে।
শুধু তাই নয়, মাতৃদুগ্ধ যে একজন নবজাতকের শ্রেষ্ঠ খাবার সেইবিষয়ে বলতে গিয়ে ডাচ গবেষকরা জানিয়েছেন, করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরে মোট ৩০ জন মায়ের বুকের দুধে অ্যান্টিবডি পাওয়া গিয়েছে। আর এই অ্যান্টিবডি করোনার মতো যেকোনও ধরনের ক্ষতিকারজ জীবাণুকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
ফলে পৃথিবীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংক্রমিত সবচেয়ে দুর্বল লোকদের সুরক্ষার জন্য মায়ের বুকের দুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনটাই দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন যে, এটি সরবরাহ করার সর্বোত্তম উপায়টি হল পানীয় হিসেবে নয়, বরং বরফের কিউব আকারে ব্যবহার করতে হবে।
এটি অ্যান্টিবডিগুলিকে মুখ এবং শ্লেষ্মা ঝিল্লিগুলিকে সংযুক্ত করার আরও সুযোগ দেয়,যেখানে তারা করোনভাইরাসকে শরীরে আরও ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেয়। শুধু তাই নয়, করোনাকে জয় করা বিভিন্ন মানুষের অ্যান্টিবডি সমৃদ্ধ রক্ত ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোভিড পজিটিভ রোগীদের চিকিত্সার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
ডাচ গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, নবজাতকের জন্মের পর একজন মায়ের বুকের প্রথম আঠালো হলুদ দুধ করোনাভাইরাস সহ যেকোনও ভাইরাসঘটিত রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দারুণ কার্যকরী। কারণ, এই দুধ প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবডিতে সমৃদ্ধ থাকে। যা পৃথিবীর আর অন্য কোনও খাবার এমনকি ওষুধপত্র থেকেও মেলে না।
এই বিষয়ে আমস্টারডাম ইউএমসির এমা চিলড্রেনস হসপিটাল এবং অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা একটি প্রাথমিক গবেষণাও গত এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছিল।
আমস্টারডাম ইউএমসির ডাচ ব্রেস্ট মিল্ক ব্যাংকের ডা: ব্রিট ভ্যান কুলেন বলেছেন, ‘আমরা জানি মায়ের দুধ নবজাতক শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ‘কারণ বুকের দুধে অ্যান্টিবডি রয়েছে। বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মা তার নিজের অ্যান্টিবডিগুলি তাঁর সন্তানের কাছে পৌঁছে দেন। ‘ এই অ্যান্টিবডিগুলি করোনভাইরাসের মতো রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
এক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি গুলির ভূমিকা হল, রোগজীবাণুগুলিকে আক্রমণ করা এবং এটি অন্যান্য প্রতিরোধক কোষ, যেমন টি-কোষগুলিকে চিহ্নিত করা। নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডিগুলি অন্য প্রতিরোধক কোষকে আক্রমণ করার পরিবর্তে ভাইরাসটিকে নিজেই মেরে ফেলতে সক্ষম হয়।
হাকীম এফ শাহজাহান
ডিইউএমএস
হামদর্দ ইউনানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,বগুড়া।
চেম্বার : শেফা স্মার্ট হাসপাতাল.খান্দার তিনমাথা মোড়,বগুড়া।
০১৭৩৫ ৭০২৭৫২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *