‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ একটি ভয়ানক রোগ

সাধারণত ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কখনোই স্বীকার করেন না যে তাদের কোন সমস্যা রয়েছে এবং তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তাদের পড়ালেখার বা কর্মস্থলে, পরিবারে, বন্ধু মহলে বা সামাজিক ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পরতে পারে। সঠিক সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তির অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং আচরণ শনাক্ত করার মাধ্যমে এই রোগের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

 

ইটিং ডিজঅর্ডারের কারণঃ কিছু পারিপার্শ্বিক কারণ এর সাথে জড়িত তবে সঠিক কি কারণ হয়ে থাকে এটা এখনও অজানা।

বংশগত কারণেঃ কিছু মানুষের জিনগত কারণে এই সমস্যা হতে পারে। নিকট আত্মীয়দের বিশেষ করে বাবা-মা, ভাইবোনের মাঝে যদি এই সমস্যা থাকে তবে সেই ব্যক্তির আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।

মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কারণেঃ ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্তদের মনস্তাত্ত্বিক ও মানসিক সমস্যা থাকে। তারা সাধারণত কম আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, আবেগ প্রবণ আচরণ, ত্রুটিপূর্ণ সম্পর্ক, দেহের আকার আকৃতি ও অতিরিক্ত ওজন নিয়ে রসিকতার সম্মুখীন,পারিবারিক সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে থাকে।যার ফলে ধীরে ধীরে এইসব আচরণের কারণে তাদের মাঝে ইটিং ডিজঅর্ডারের প্রবণতা দেখা দেয়।

সমাজ ব্যবস্থাঃ জনপ্রিয় সমাজ ব্যবস্থায় সাফল্য ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সর্বত্রই জিরো ফিগারের জয় জয়কার। কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বস্তনদের চাপে এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখে অনেকেই ক্ষীণকায় হবার আশায় এতে আক্রান্ত হোন।

কষ্টকর পরিস্থিতিঃ স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অথবা কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির চাপ সামাল দিতে গিয়েও হতে পারে।

ইটিং ডিজঅর্ডারের রিস্ক ফ্যাক্টর / ঝুঁকির কারণঃ সাধারণত কিছু পরিস্থিতি ও ঘটনা ইটিং ডিজঅর্ডারের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়।

নারী হওয়ার কারণেঃ সাধারণত কিশোরী মেয়েরা এবং অল্পবয়স্ক নারীরা, কিশোর ছেলে বা অল্পবয়স্ক পুরুষের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন।এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরাও এতে আক্রান্ত হন।

বয়সঃ ইটিং ডিজঅর্ডার রোগটি শৈশব, কৈশোর থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত একটি বিস্তৃত বয়স সীমার মাঝে হতে পারে।

পারিবারিক ইতিহাসঃ যাদের পরিবারে মা-বাবা ও ভাইবোনের মাঝে এটা থাকে তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

মানসিক রোগঃ দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা বা মানসিক বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ইটিং ডিসঅর্ডার বেশি হয়।

খাদ্য নিয়ন্ত্রণঃ কিছু ব্যক্তি ওজন কমানোর মাধ্যমে তাদের শারীরিক পরিবর্তনের জন্য অন্যদের কাছ থেকে ইতিবাচক মন্তব্য পেয়ে আরো বেশি ওজন কমানোর জন্য অতি উৎসাহিত হয়ে ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়ে যায়।

খেলাধুলা, কাজ এবং শৈল্পিক কর্মকাণ্ডেঃ অ্যাথলেট, অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী এবং মডেলরা এই রোগের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন।

কোচ এবং অভিভাবকদের ওজন কমানোর ব্যাপারে অজ্ঞাত উৎসাহ দানের ফলে অ্যাথলেটরা ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হয়।

ইটিং ডিজঅর্ডারের লক্ষণঃ ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে যেসব লক্ষণ গুলো দেখা যায় সেগুলো হলো:-

(১) কোন অজুহাত তৈরি করে খাবার বাদ দেয়া বা না খাওয়া।

(২) মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত নিরামিষভোজী হয়ে যায়।

(৩) স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে অতিরিক্ত নজর দেয়া।

(৪) পরিবারের সবার সাথে একই খাবার না খেয়ে নিজের জন্য আলাদা খাবার তৈরি করে খাওয়া।

(৫) স্বাভাবিক সামাজিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরে যাওয়া।

(৬) বেশিরভাগ সময় নিজের বেশি ওজন নিয়ে অভিযোগ করা এবং কিভাবে ওজন কমানো যায় সেই বিষয়েই সারাক্ষণ কথা বলা।

(৭) বার বার আয়না দেখা এবং নিজের ওজন সম্পর্কিত শারীরিক ত্রুটি খুঁজে বের করা।

(৮) অতিরিক্ত ব্যায়াম করা।

(৯) বার বার মিষ্টি বা উচ্চ চর্বি জাতীয় খাবার প্রচুর পরিমাণে খাওয়া।

(১০) ওজন কমানোর জন্য ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট, ল্যাকজেটিভ বা ভেষজ ঔষধ খাওয়া।

(১১) মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ইচ্ছাকৃত বমি করা।

(১২) অতিরিক্ত বমির ফলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে যাওয়া।

(১৩) খাওয়ার মাঝে উঠে টয়লেটে যাওয়া।

(১৪) নাস্তা বা যেকোনো বেলায় খাওয়ার সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া।

(১৫) খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে বিষণ্নতা, বিতৃষ্ণা,লজ্জা বা অপরাধবোধ প্রকাশ করা।

(১৬) জনবহুল জায়গায় বিশেষ করে রেস্তোরায় খাবার খেতে অসস্তিবোধ করা বা খেতে না চাওয়া। তাই যাদের মাঝে এসব লক্ষণগুলোর বেশীরভাগ প্রকাশ পায় তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে প্রয়োজনে যোগ্যতাসম্পন্ন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শও নিতে হবে।

প্রতিকারঃ ইটিং ডিজঅর্ডারের চিকিৎসা একটু সময় সাপেক্ষ তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময় যোগ্য। সেক্ষেত্রে অবশ্যই আক্রান্ত ব্যক্তির ভালো হওয়ার ইচ্ছে থাকতে হবে এবং তাকে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সহায়তা করতে হবে।

এই রোগের চিকিৎসায় সাধারণত শারীরিক সমস্যা সমাধানের সাথে সাথে মানসিক অবস্থাও মনিটর করা হয়।

(১) আক্রান্ত ব্যক্তির নিজেকে সাহায্য করার বই, স্বাস্থ্য পরিচর্যাকারীর ও থেরাপিস্টের সাহায্য নিতে হবে।

(২) রোগীর অবস্থার গুরুত্বের উপর নির্ভর করে সম্পর্ক ভিত্তিক বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দেয় এমন থেরাপি নিতে হবে ।

(৩) ডায়েট কাউন্সেলিং- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মেনে চলার জন্য ডায়েট কাউন্সেলিং করতে হবে।

(৪) পারিবারিক থেরাপি- ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণ কিভাবে তাদের উপর এবং তাদের পরিবারের উপর প্রভাব ফেলে তা আলোচনা করার থেরাপিও নিতে হবে। ইটিং ডিজঅর্ডার রোগটি নিরাময় যোগ্য কিন্তু এটা নির্ভর করে রোগীর অবস্থার উপর।কারণ আক্রান্ত ব্যক্তির যত দ্রুত শনাক্ত হবে তত দ্রুত তারা সেরে উঠবে। তাই যখনি কোন ব্যক্তির মাঝে এর লক্ষণ প্রকাশ পায় দেরি না করে সাথে সাথে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *